বাংলাদেশি মিশনগুলোর ওয়েবসাইট
বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনের ওয়েবসাইটগুলো সম্পর্কে জানতে গিয়ে আরেকবার বাংলাদেশের জাতীয় ওয়েব পোর্টালের দুর্বলতা খুঁজে পাওয়া গেল। জাতীয় ওয়েব পোর্টালে (www.bangladesh.gov.bd) দেওয়া সংযুক্তি (লিংক) অনুযায়ী ১৭টি দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি হাইকমিশন, দূতাবাস ও কনসুলেট অফিসের মোট ২১টি ওয়েবসাইট রয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (www.mofa.gov.bd) গিয়ে দেখা যায়, সংখ্যাটি হলো ২৫টি দেশের ৩০টি ওয়েবসাইট। যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ২৫টি দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনের ওয়েবসাইটের সংখ্যা কেন ৩০টি? কারণ একটি দেশে হাইকমিশন বা দূতাবাসের ওয়েবসাইট থাকার পরও দূতাবাস বা হাইকমিশনের শাখা অফিস কনসুলেটের জন্য আলাদা ওয়েবসাইট আছে। বিদেশি মিশনগুলোর ওয়েবসাইটের একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাষ্ট্রদূত কিংবা হাইকমিশনার বা কনসাল জেনারেলের বাণী দেওয়া আছে; যেমন দেশের জেলা ওয়েবসাইটগুলোতে আছে জেলা প্রশাসকের বাণী। এই বাণী-সংস্কৃতি মূলত আমাদের ‘আমলাতান্ত্রিক’ মানসিকতার ফল। এটি এখনই বাদ দেওয়া দরকার।
ওয়েবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষেত্রে বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের ওয়েবসাইটগুলোর সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। যাঁরা ওয়েবসাইটগুলো নির্মাণ করেছেন তাঁরা হয়তো মনে করেছেন, ওয়েবসাইটের মাস্টহেড বা শিরোনাম অংশে কিছু বাংলাদেশি ছবি দিয়ে দিলেই বোধহয় বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা হলো। বিষয়টি আসলে তা নয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, দেশের মানুষের জীবনবোধ ও বিদেশে বাংলাদেশিদের অবদানের চিত্র তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে প্রকাশ করার যে প্রয়াস থাকা দরকার তা ওয়েবসাইটগুলোতে অনুপস্থিত।
কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়া অন্য কোনো কাজ রয়েছে বাংলাদেশি মিশনগুলোর, তা বিবেচনায় নিলে মোটা দাগে বলতে হয়, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের ব্যবহারকারী হলো প্রবাসী বাংলাদেশি, যাঁরা তাঁদের নানা প্রয়োজনে নিজ দেশের মিশন ব্যবহার করেন; এবং বিদেশি নাগরিক, যাঁরা বাংলাদেশে আসতে চান কিংবা বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান। তৃতীয় ব্যবহারকারী পক্ষটি হলো দেশে অবস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের আত্মীয়স্বজন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে বলা আছে—২০০৭ সালে প্রবাসী ও তাঁদের আত্মীয়স্বজন যাঁরা দেশে বাস করেন, তাঁদের তথ্যসহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ ওয়েবসাইটগুলো তৈরি করা হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তা দেওয়া যদি ওয়েবসাইট নির্মাণের একটি উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে প্রতিটি ওয়েবসাইটের একটি করে বাংলা সংস্করণ থাকা দরকার। কারণ, বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। আমরা এটিকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘ পর্যায়ে দাবি জানাচ্ছি। বিদেশে অবস্থানরত আমাদের দেশের প্রবাসী ভাইবোনেরা সবাই ইংরেজি ভাষায় দক্ষ নন।
ওয়েবসাইটগুলো পর্যালোচনার সময় দেখা গেছে, এসবে তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়নি। ইচ্ছামাফিক সেগুলো তৈরি করা হয়েছে। মনে রাখা উচিত, ওয়েব একটি উন্মুক্ত স্থান। এটি কোনো ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়। ওয়েবে বিচরণের ক্ষেত্রে সবাই বিশ্ব-নাগরিক। যে কেউ যেকোনো ওয়েবসাইট যেকোনো অবস্থান থেকে দেখতে পারেন। তাই বাংলাদেশি মিশনগুলোর ওয়েবসাইটে কী ধরনের তথ্য থাকবে এবং কোন তথ্যের পর কোনটি সাজানো হবে, তার একটি গাইডলাইন থাকা দরকার। অর্থাত্ একটি নির্দিষ্ট সাইটম্যাপ সব দূতাবাস, হাইকমিশন ও কনসুলেট অফিসের অনুসরণ করা দরকার। কনসুলেট অফিসের জন্য পৃথক ওয়েবসাইট না থেকে এটি দূতাবাস বা হাইকমিশনের লিংক হিসেবে থাকলেই ভালো হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ৪৫টি দেশে বাংলাদেশি মিশন রয়েছে। ওই দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও আছে। এ অবস্থায় সব দেশের জন্য আমাদের ওয়েবসাইট থাকা দরকার। সাম্প্রতিক কালে অনেক হাইকমিশন, দূতাবাস ও কনসুলেট জেনারেল অফিসের ওয়েবসাইট নতুন করে সাজানো হয়েছে। কিন্তু তাতে অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। নতুন ওয়েবসাইটগুলোতে ২০০৭ সালের তুলনায় তথ্যের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। দু-একটি নতুন বিভাগও যুক্ত হয়েছে। কিন্তু তথ্য ও ওয়েবসাইটের গুণগত পরিবর্তন ঘটেনি।
আমরা আশা করতে পারি, এ মুহূর্তে আমাদের দেশে জেলাগুলো নিয়ে যেভাবে শক্তিশালী ডিজিটাল তথ্য বাতায়ন তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছে, সে রকমই একটি চেষ্টা অচিরেই বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলোর ক্ষেত্রে ঘটবে। এটি যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল।
Source: Prothom-alo
0 comments:
Post a Comment